ইরান যুদ্ধ: চীনের হার্ডওয়ার আর রাশিয়ার ইন্টেরিজেন্স নির্ভর “দ্যা ওয়ার অব সিগন্যালস্”
আন্তর্জাতিক নিউজ ডেস্ক: রাশিয়া একটা গোপন প্রতিশোধ নিচ্ছে। পুতিনের বাসভবনের কাছে একবার ড্রোন হামলা করেছিল ইউক্রেন। এই হামলায় টার্গেটিং ইন্টেলিজেন্স সরবরাহ করেছিল আমেরিকা। এখন মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ব্যাপারে তেহরানকে টার্গেট লোকেশন শেয়ার করছে রাশিয়া। এতে আমেরিকা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। আবার হরমুজ প্রণালি বন্ধের সুযোগে তেল বিক্রি করে বিপুলভাবে লাভবানও হচ্ছে মস্কো।
আলজাজিরা The war of signals নামে এক প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, রাশিয়া ও চীন চলমান যুদ্ধে কীভাবে ইরানকে সহায়তা করছে। রিপোর্টে বলা হয়, ইরান যুদ্ধ কেবল মিসাইল বা বোমার যুদ্ধ নয়, বরং ইনফরমেশন, স্যাটেলাইট ও ইলেক্ট্রিক সিগনালের যুদ্ধ।
সিআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা ব্রুস রিডেল বলেন, আধুনিক যুদ্ধে গুলির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে শত্রুর অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য (coordinates)। শত্রু কোথায় আছে- যে পক্ষ এটা জানে, শেষ পর্যন্ত সেই পক্ষই যুদ্ধে জয়ী হয়।
ইরানের নিখুঁত হামলা দেখে হতবাক হয়ে পড়েছিল মার্কিন বাহিনী। বিশেষ করে কুয়েতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে যে ড্রোন হামলা করেছিল, সেই ঘাঁটির অবস্থান কোনো ওপেন সোর্স থেকে জানা সম্ভব ছিল না। অথচ ইরানী ড্রোন নিখুঁতভাবে তাদের অবস্থান খুঁজে বের করে হামলা চালিয়েছিল। ওই হামলায় ৬ মার্কিন সেনা নিহত হয়।
ওয়াশিংটন পোস্টের কাছে পেন্টাগনের কর্মকর্তারা বলছেন, এই হামলা আন্দাজে বা কাকতালীয়ভাবে হয়নি। নিশ্চয় কেউ গোপন তথ্য দিয়েছে। কারণ, যেসব টার্গেটে হামলা হয়েছে, তার সবগুলো ইরানের বিরুদ্ধে অপারেশনাল ছিল। আর কারা তথ্য দিতে পারে, সেটা অনুমান করা কঠিন কিছু না।
মার্কিন সিনিয়র কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, ইরানকে সেন্সিটিভ গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে রাশিয়া এবং চীন। এসব তথ্যের মধ্যে আছে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের অবস্থান, আকাশে যুদ্ধবিমানের অবস্থান ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির সঠিক কোঅর্ডিনেটস।
ওই ঘটনার পর ট্রাম্প ফোন দিয়েছিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনকে। পুতিন অস্বীকার করে বলেছেন, তারা এ ব্যাপারে কিছু জানেন না।
এদিকে, ইরাকের যে ইবরিল সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা হয়েছে, সেখানে ব্রিটিশ ও আমেরিকান সৈন্যরা অবস্থান করছিল । ঘটনার পর ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি বলেছেন, এই হামলায় পুতিনের hidden hand আছে। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, রাশিয়া সরাসরি যুদ্ধে না থাকলেও ইরানকে কৌশলগত সহায়তা দিতে পারে।
ব্রিটিশ সামরিক কর্মকর্তাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরানি ড্রোনগুলো অনেক নিচু উচ্চতায় উড়ে রাডার এড়িয়ে যায়। এতে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার সম্ভাবনা বাড়ে। এই কৌশলটি আগে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে। সেসময় তারা Shahed kamikaze drone ব্যবহার করে। এই ড্রোনগুলো ইরানের, কিন্তু ব্যবহারের অভিজ্ঞতা ও হামলার কৌশল রাশিয়ার।
ইরানের নিজস্ব সামরিক নজরদারি স্যাটেলাইট খুব কম। তাদের সক্ষমতা দিয়ে সমুদ্রে দ্রুত চলমান যুদ্ধজাহাজ টার্গেট করা সম্ভব না। কিন্তু রাশিয়ার আছে উন্নত নজরদারি স্যাটেলাইট। যেমন Kanopus‑V ধরনের স্যাটেলাইট দিয়ে টার্গেটের উচ্চ রেজুলেশন ছবি, রাডার ইমেজ ও লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান নিশ্চিতভাবে জানা যায়। অন্যদিকে, চীনের BeiDou নেভিগেশন সিস্টেম ব্যবহার করার কারণে ইরানের মিসাইল গাইডেন্স পাচ্ছে নিখুঁতভাবে।
আলজাজিরা বলছে, চীনের হার্ডওয়ার আর রাশিয়ার ইন্টেলিজেন্স – এই দুটো জিনিস পেয়ে ইরান তার সক্ষমতার সর্বোচ্চ দেখাচ্ছে। এই যুদ্ধ সিগনালের যুদ্ধ। রাডার বিম এখন বড় অস্ত্র। ইন্টেলিজেন্স বড় মুদ্রা। রাশিয়ার সামরিক ঘাঁটিতে হামলায় যুক্তরাষ্ট্র এই মুদ্রা দিয়ে ইউক্রেনের পেছনে ছিল। রাশিয়া এখন সেই প্রতিশোধ নিচ্ছে।
সিএনএন লিখেছে, ইরান যুদ্ধে রাশিয়ার লাভ বেশি। গোপনে তেহরানকে সহায়তা করে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতি করছে। আবার যুদ্ধের কারণে তেল সরবরাহ বন্ধ থাকায় রাশিয়া অনেক বেশি তেল বিক্রি করে লাভবান হচ্ছে। এছাড়া ইউক্রেনের উপর থেকে বিশ্ববাসীর ফোকাস সরে গেছে। এতে আপাতত আন্তর্জাতিক চাপ থেকে মুক্ত রাশিয়া।