ফিতরা: আত্মশুদ্ধি, দায়িত্ববোধ ও সামাজিক সাম্যের অনিবার্য বিধান
পবিত্র কুরআন ও হাদিস–এর আলোকে ইসলামে ফিতরা (সাদাকাতুল ফিতর) এক গুরুত্বপূর্ণ ও ওয়াজিব ইবাদত। মাহে রমজানের সিয়াম সাধনার পর ঈদুল ফিতরের আনন্দকে পরিপূর্ণ ও সার্বজনীন করতে ফিতরার বিধান প্রবর্তিত হয়েছে। এটি নিছক দান নয়; বরং রোজাদারের অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি-বিচ্যুতির পরিশুদ্ধি এবং দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর এক অনন্য সামাজিক ব্যবস্থা।
ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন এবং নিসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফিতরা আদায় ওয়াজিব। এখানে উল্লেখ্য, যাকাতের মতো সম্পদের ওপর এক বছর অতিক্রান্ত হওয়া ফিতরার ক্ষেত্রে শর্ত নয়। ঈদের দিন সূর্যাস্তের পূর্বে যদি কারও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাদে নিসাব পরিমাণ সম্পদ বিদ্যমান থাকে, তবে তার ওপর ফিতরা আবশ্যক হবে।
পরিবারপ্রধান ব্যক্তির ওপর নিজের পাশাপাশি অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের পক্ষ থেকেও ফিতরা আদায়ের দায়িত্ব বর্তায়। অনুরূপভাবে, যেসব নিকট আত্মীয়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব তার ওপর ন্যস্ত, তাদের পক্ষ থেকেও ফিতরা প্রদান করতে হয়। তবে স্ত্রী যদি নিজেই নিসাবের মালিক হন, তাহলে তার ফিতরা আদায়ের দায়িত্ব তার নিজের ওপরই বর্তায়— যদিও পারিবারিকভাবে স্বামী তা আদায় করে থাকেন।
হাদিস শরিফে এক ‘সা’ পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য ফিতরা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। সাহাবায়ে কেরামের যুগে খেজুর, যব, কিশমিশ কিংবা গমের মাধ্যমে তা আদায় করা হতো। বর্তমান সময়ে দেশের প্রচলিত খাদ্যদ্রব্য বা তার সমমূল্যের অর্থ দিয়েও ফিতরা আদায় করা যায়। আমাদের দেশে প্রতি বছর ইসলামিক ফাউন্ডেশন ফিতরার ন্যূনতম ও সর্বোচ্চ হার নির্ধারণ করে দেয়, যাতে সামর্থ্য অনুযায়ী মুসলমানরা তা আদায় করতে পারেন।
ফিতরা আদায়ের উত্তম সময় হলো ঈদের নামাজের পূর্বে। তবে রমজান মাস চলাকালীন সময়েও তা প্রদান করা বৈধ, যাতে দরিদ্র মানুষ ঈদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারেন। ফিতরা মূলত সেইসব দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত মুসলমানদের প্রাপ্য, যারা যাকাত পাওয়ার উপযুক্ত। নিকট আত্মীয়দের মধ্যে কেউ যদি অভাবী হন এবং তার ভরণপোষণের দায়িত্ব প্রদানকারীর ওপর না থাকে, তবে তাকে ফিতরা প্রদান অধিক সওয়াবের কাজ।
ফিতরার সামাজিক তাৎপর্য অনস্বীকার্য। রমজান আমাদের সংযম, সহমর্মিতা ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দেয়। ফিতরা সেই শিক্ষাকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগের একটি কার্যকর মাধ্যম। ধনী-গরিবের ব্যবধান কমিয়ে ঈদের আনন্দকে সবার জন্য উন্মুক্ত করার মধ্যেই এই বিধানের প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত। একটি ন্যায়ভিত্তিক ও সহানুভূতিশীল সমাজ গঠনে ফিতরার ভূমিকা গভীর ও সুদূরপ্রসারী।
আজ যখন সমাজে বৈষম্য ও অর্থনৈতিক চাপ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন ফিতরার চেতনাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়— প্রকৃত ঈদ তখনই, যখন সমাজের প্রত্যেক মানুষ আনন্দে শরিক হতে পারে। সামর্থ্যবানদের উচিত দায়িত্বশীলতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে ফিতরা আদায় করা, যাতে ঈদের দিন কোনো ঘর অন্ধকার না থাকে।
রমজানের আত্মশুদ্ধির সাধনা ফিতরার মাধ্যমে পূর্ণতা পায়। এটি ধর্মীয় কর্তব্যের পাশাপাশি মানবিক দায়বদ্ধতারও বহিঃপ্রকাশ। আসুন, আমরা শরিয়তের নির্দেশনা মেনে যথাযথভাবে ফিতরা আদায় করি এবং সাম্য, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ একটি কল্যাণমুখী সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখি।