খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় শসার বাম্পার ফলন। রমজানে উন্নত বীজ ও আধুনিক চাষ পদ্ধতি কৃষকের আয় বাড়িয়েছে
নিজস্ব প্রতিবেদক, খাগড়াছড়ি: পবিত্র রমজানকে সামনে রেখে পাহাড়ি জনপদে এবার শসার বাম্পার ফলন ঘিরে বইছে আনন্দের হাওয়া। খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলায় চলতি মৌসুমে শসা চাষে রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদনের আশা করছেন কৃষক ও কৃষি বিভাগ। অনুকূল আবহাওয়া, উন্নত জাতের বীজ এবং আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির সমন্বয়ে এ সাফল্য এসেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত মৌসুমে প্রায় ২০ হেক্টর জমিতে শসা চাষ করে উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ৪০০ মেট্রিক টন। এবার আবাদি জমির পরিমাণ ও ফলন—দুই-ই বেড়েছে। চলতি মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৪৫০ মেট্রিক টন। ইতোমধ্যে ক্ষেতভর্তি সবুজ শসা স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে চট্টগ্রাম ও দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে সরবরাহ শুরু হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, ‘কাঞ্চন’, ‘গ্রিন বিউটি’ ও ‘সাবিরা গোল্ড’ জাতের শসা এবার ভালো ফলন দিয়েছে। রোগবালাই তুলনামূলক কম হওয়ায় উৎপাদন খরচও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেতেই বাঁশের মাচা পদ্ধতিতে চাষ হওয়ায় গাছের বৃদ্ধি ও ফলন ভালো হয়েছে।
উপজেলার কৃষক আবুল কাশেম বলেন, “প্রায় ৩০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে এক বিঘা জমিতে শসা চাষ করেছি। বাজারদর ভালো থাকলে এক লাখ টাকার বেশি বিক্রি সম্ভব।” তাঁর মতো অনেক কৃষকই এবার লাভের মুখ দেখার আশায় রয়েছেন।
রমজানে ইফতার সামগ্রীর অন্যতম উপকরণ শসা। তাই চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি শসা ৭০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি বাজারেও দাম সন্তোষজনক। ফলে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয় আড়তদারদের মতে, পাহাড়ি অঞ্চলের শসা স্বাদ ও সতেজতার কারণে ভোক্তাদের কাছে জনপ্রিয়। দ্রুত পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতির ফলে উৎপাদিত শসা সময়মতো বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে, যা কৃষকের লাভ বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
মাটিরাঙা উপজেলা কৃষি অফিসের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জানান, মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শ, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করায় ফলন বেড়েছে। কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনী প্লট স্থাপনের মাধ্যমে উন্নত জাতের বীজ ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে উৎপাদন সম্ভব।
শুধু কৃষকই নন, ক্ষেতমজুর, পরিবহন শ্রমিক, আড়তদারসহ সংশ্লিষ্ট অনেকের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে এই মৌসুমে। ফলে শসা চাষকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে সচলতা ফিরেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সঠিক পরিকল্পনা ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে ভবিষ্যতে পাহাড়ি অঞ্চল দেশের শাকসবজি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাহাড়ি মাটির উর্বরতা ও অনুকূল জলবায়ু কাজে লাগিয়ে বছরজুড়ে বিভিন্ন সবজি আবাদ সম্ভব। প্রয়োজন কেবল সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ অবকাঠামো।
রমজানের বাজারে পাহাড়ি শসার এমন সাফল্য তাই শুধু একটি মৌসুমি খবর নয়—এটি সম্ভাবনার গল্প, স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন এবং পাহাড়ি কৃষির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।