মায়া রানীর পাশে মানবিকতা
নিজস্ব প্রতিবেদক
দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল থেকে আসা ৩০ বছর বয়সী অন্তঃসত্ত্বা নারী মায়া রানী চাকমার জীবন রক্ষায় মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতাল। চিকিৎসক, ইন্টার্ন ডাক্তার ও সমাজসেবা কার্যালয়ের সমন্বিত উদ্যোগে সংকটাপন্ন এই রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, কাউখালী উপজেলার একটি দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে প্রায় ৩১ সপ্তাহের গর্ভধারণ অবস্থায় সোমবার (২২ জুন) সকালে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন মায়া রানী চাকমা। হাসপাতালে আনার আগেই তিনি টানা প্রায় ছয় ঘণ্টা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ভুগছিলেন।
ভর্তির পর চিকিৎসকেরা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও শারীরিক অবস্থা পর্যালোচনা করে দেখতে পান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর রক্তস্বল্পতা বা ‘সিভিয়ার অ্যানিমিয়া’য় আক্রান্ত। এ অবস্থায় শরীরে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় মা ও গর্ভের সন্তানের জীবনই ঝুঁকির মুখে পড়ে।
রোগীর স্বজনদের আর্থিক অক্ষমতার কারণে জরুরি সাতটি পরীক্ষার মধ্যে মাত্র দুটি পরীক্ষা করানো সম্ভব হয়েছিল। এরপরও চিকিৎসকেরা রোগীর অবস্থা বিবেচনায় দ্রুত জীবনরক্ষাকারী ওষুধ প্রয়োগ এবং রক্ত সঞ্চালনের ব্যবস্থা করেন। এতে কিছুটা উন্নতি দেখা গেলেও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়নি। একই সঙ্গে রক্তচাপও ছিল অস্বাভাবিক।
পরিস্থিতির অবনতি এবং চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রোগীকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেন কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা। তবে পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার কারণে তারা চট্টগ্রামে যেতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। এমনকি ঝুঁকি নিয়েও রাঙামাটিতেই চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা জানান।
এ অবস্থায় দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকেরা বিষয়টি হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মুহাম্মদ শওকত আকবর খানকে অবহিত করেন। পরে তাঁর উদ্যোগে সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহায়তায় রোগীর অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ার ব্যবস্থা করা হয়। একই সঙ্গে মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা তাৎক্ষণিকভাবে চার হাজার টাকা সংগ্রহ করে রোগীর পরিবারের হাতে তুলে দেন, যাতে চট্টগ্রামে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হয়।
সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত হওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার আশায় মায়া রানী চাকমাকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, ইন্টার্ন চিকিৎসক ও সমাজসেবা বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রশংসা করেছেন রাঙামাটির সিভিল সার্জন ও হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. নূয়েন খীসা। তিনি বলেন, দুর্গম অঞ্চলের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকারি হাসপাতালগুলো সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে। একই সঙ্গে সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান মানুষদের অসহায় রোগীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
চিকিৎসকেরা জানান, অনেক সময় রোগীর জীবন রক্ষার স্বার্থেই জেলা পর্যায়ের হাসপাতালের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠাতে হয়। মায়া রানী চাকমার ক্ষেত্রেও সেই কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তই নিতে হয়েছে, যাতে মা ও অনাগত সন্তানের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়।
দুর্গম পাহাড়ের এক অসহায় নারীর চিকিৎসা সহায়তায় হাসপাতাল পরিবারের এই মানবিক উদ্যোগ এখন রাঙামাটিজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে। মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও পেশাগত অঙ্গীকারের এই সমন্বয় যেন স্বাস্থ্যসেবার প্রকৃত চিত্রই নতুন করে তুলে ধরেছে।