শিলছড়িতে বিশুদ্ধ পানির হাহাকার: একটি টিউবওয়েলের ওপর নির্ভর প্রায় ২ হাজারের অধিক মানুষের জীবন
আবদুল হাই খোকন :
পার্বত্য জেলা রাঙামাটির দুর্গম শিলছড়ি এলাকায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট এখন মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। শীলছড়ি বাজার, ভেলুয়াপাড়া, ওয়াপদা, ইষ্টার্লিং, মাঠ এলাকা, বালুরচর, সিতারঘাট ও হাজিরটেক সহ আরো কয়েকটি পাড়া-মহল্লার প্রায় দুই হাজারের বেশি মানুষ বর্তমানে নির্ভর করছেন মাত্র একটি টিউবওয়েলের ওপর।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শিলছড়ি আনসার ক্যাম্প সংলগ্ন একটি মাত্র টিউবওয়েল থেকেই দীর্ঘদিন ধরে এলাকার মানুষ পানীয় জল সংগ্রহ করছেন। কিন্তু সেটিও দুই-তিন দিন পরপর নষ্ট হয়ে যায়। অনেক সময় পর্যাপ্ত পানি ওঠে না, আবার কখনো আয়রনের মাত্রা বেশি থাকায় পানির রং ও স্বাদ নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে পানি সংগ্রহ করতে হয় নারী-শিশু ও বৃদ্ধদের।
শিলছড়ি বাজার এলাকার বাসিন্দারা জানান, বিকল্প কোনো গভীর নলকূপ বা সরকারি পানির লাইন নেই। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঝিরির পানি ব্যবহার করা গেলেও শুষ্ক মৌসুমে তা শুকিয়ে যায়। তখন একমাত্র ভরসা এই টিউবওয়েল। অনেকে বাধ্য হয়ে দূরের উৎস থেকে পানি আনছেন, যা সময়সাপেক্ষ ও কষ্টকর।
স্থানীয় এক গৃহিণী বলেন, “ভোর ৫টায় এসে লাইনে দাঁড়াই। পানি না উঠলে খালি কলস নিয়েই বাড়ি ফিরতে হয়।”
একজন বয়োজ্যেষ্ঠ বাসিন্দা জানান, “ দুই হাজারের বেশি মানুষের জন্য একটি টিউবওয়েল যথেষ্ট নয়। দ্রুত নতুন গভীর নলকূপ বসানো দরকার।”
বিশুদ্ধ পানির অভাবে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। আয়রনসমৃদ্ধ পানি দীর্ঘদিন পান করলে নানা শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে—এমন উদ্বেগও রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় নিরাপদ পানির উৎস নিশ্চিত করতে গভীর নলকূপ বা আয়রন রিমুভাল প্ল্যান্ট স্থাপন কার্যকর সমাধান হতে পারে। তবে শিলছড়ি এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।
এলাকাবাসী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ সংশ্লিষ্টদের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাঁদের দাবি, অন্তত দুটি গভীর নলকূপ স্থাপন এবং আয়রনমুক্ত বিশুদ্ধ পানির স্থায়ী ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, নিরাপদ পানি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার রয়েছে। অথচ শিলছড়ির মানুষ এখনো একটি নলকূপের ওপর নির্ভরশীল।
শিলছড়ির সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—অবিলম্বে জরুরি ভিত্তিতে পরিস্থিতি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মানবিক এই সংকট নিরসনে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগই পারে অত্র এলাকার মানুষের কষ্ট লাঘব করতে।
শিলছড়ির এই পানিসংকট কেবল একটি এলাকার সমস্যা নয়; এটি প্রান্তিক জনপদের মৌলিক অধিকার বঞ্চনার এক প্রতিচ্ছবি। এখন দেখার বিষয় কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়।