কাপ্তাইয়ের মিতিঙ্গাছড়ি এখন ‘এসডিজি ভিলেজ’

পাহাড়ের গ্রামে উন্নয়নের নতুন স্বপ্ন, বদলের অপেক্ষায় ১৭০ পরিবার

নিজস্ব প্রতিবেদক

পাহাড়-সবুজে ঘেরা মিতিঙ্গাছড়ি। পাশাপাশি বসবাস বাঙালি ও মারমা পরিবারের। অথচ গ্রামটিতে নেই নিজস্ব প্রাথমিক বিদ্যালয়, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা। আধুনিক স্যানিটেশন সুবিধাও অপ্রতুল। এমন বাস্তবতার মধ্যেই নতুন পরিচয় পেল রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার চন্দ্রঘোনা ইউনিয়নের মিতিঙ্গাছড়ি।

সোমবার (১০ আগস্ট) রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র থেকে টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে মিতিঙ্গাছড়িসহ দেশের তিনটি গ্রামকে ‘এসডিজি ভিলেজ’ হিসেবে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অন্য দুটি গ্রাম হলো খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী ও দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার নাফানগর।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ।’ প্রত্যন্ত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করাই এসডিজি বাস্তবায়নের অন্যতম লক্ষ্য। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপদ পানি, কর্মসংস্থান, নারীর ক্ষমতায়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে জনগণের অংশগ্রহণে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, স্থানীয় সম্পদ, কৃষি, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ কাজে লাগিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

মিতিঙ্গাছড়িতে ১৩৩টি বাঙালি ও ৩৭টি মারমা পরিবার বসবাস করে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গ্রামের বাসিন্দা স্বপ্না মারমা ও সুইহ্লা প্রু মারমা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। তাঁরা বিদ্যালয় না থাকা, নিরাপদ পানির সংকট ও অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থার কথা তুলে ধরেন। শুষ্ক মৌসুমে ছড়ার পানি শুকিয়ে যাওয়ায় চাষাবাদে সমস্যার কথাও জানান তাঁরা। টিউবওয়েলসহ প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে মিতিঙ্গাছড়ি সফরের আমন্ত্রণ জানান।

সরকারের ‘দেশের টেকসই উন্নয়নে অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্নির্ধারণ’ প্রকল্পের আওতায় এসডিজি ভিলেজ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসডিজির ১৭টি লক্ষ্য বাস্তবায়নের মাধ্যমে নির্বাচিত গ্রামগুলোকে টেকসই উন্নয়নের মডেল হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রায়হানুল ইসলাম বলেন, দারিদ্র্য হ্রাস, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন, নারীর ক্ষমতায়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, কৃষি ও জীবিকার উন্নয়ন এবং ডিজিটাল সেবাকে গুরুত্ব দিয়ে মিতিঙ্গাছড়িতে সমন্বিত উন্নয়ন কার্যক্রম নেওয়া হবে।

অনুষ্ঠানে রাঙামাটি জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী, পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুল রকিব পিপিএম, কাপ্তাই জোন কমান্ডার লে. কর্নেল মো. নাজমুল কাদির শুভ পিএসসি, রাঙামাটি সিভিল সার্জন ডা. নূয়েন খীসা, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিমসহ জেলা-উপজেলার কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, হেডম্যান-কার্বারি, রাজনৈতিক নেতা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এসডিজি ভিলেজ প্রকল্প শুধু উদ্বোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের সংকট কাটানোর পাশাপাশি কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও জীবিকাভিত্তিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

বাঙালি-মারমার দীর্ঘদিনের সম্প্রীতি ও পাহাড়ি প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে মিতিঙ্গাছড়িকে টেকসই উন্নয়নের মডেল হিসেবে দেখতে চান স্থানীয়রা। এখন তাঁদের অপেক্ষা—‘এসডিজি ভিলেজ’ পরিচয়টি কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনে ১৭০ পরিবারের জীবনে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
+ posts

Similar Posts

Leave a Reply