কাপ্তাইয়ে বৃষ্টির দাপটে থমকে জনজীবন

৩২ স্থানে পাহাড়ধস, ১৮ আশ্রয়কেন্দ্রে ৩১৭ জন; প্রশাসন, স্বাস্থ্য ও বিদ্যুৎ বিভাগের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি

নিজস্ব প্রতিবেদক 

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা, সড়ক যোগাযোগে বিঘ্ন, কৃষিজমিতে পানি জমে ফসলহানির শঙ্কা, বাজারে মন্দা এবং নিম্নআয়ের মানুষের কর্মসংস্থান ব্যাহত হওয়ায় পুরো উপজেলাজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে দুর্ভোগ। বৃষ্টি কিছুটা কমলেও ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার (১১ জুলাই) পর্যন্ত কাপ্তাই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ৩২টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় চারজন আহত হয়েছেন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে ১৮টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। বর্তমানে এসব কেন্দ্রে ৩১৭ জন আশ্রয় নিয়েছেন। এর মধ্যে কাপ্তাই সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৮৪ জন, কর্ণফুলী সরকারি ডিগ্রি কলেজে ৭৩ জন, কর্ণফুলী স্টেডিয়ামে ৩০ জন এবং মুরালীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩০ জন অবস্থান করছেন।

আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে আশ্রিতদের জন্য তিন বেলা খাবার, বিশুদ্ধ পানীয় জল, প্রাথমিক চিকিৎসা, চিড়া, মুড়ি, বিস্কুট ও বোতলজাত পানিসহ শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দুর্যোগে কর্মহীন হয়ে পড়া নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সরকারি সহায়তা হিসেবে চাল বিতরণ কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।

টানা বর্ষণের প্রভাব পড়েছে উপজেলার প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবন-জীবিকায়। বাজারে ক্রেতা কমে যাওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা দেখা দিয়েছে, দিনমজুরেরা কাজ হারিয়ে বিপাকে পড়েছেন, কৃষিজমিতে পানি জমে ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা বেড়েছে এবং পাহাড়ি কাঁচা সড়ক পিচ্ছিল হয়ে পড়ায় শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে। গৃহস্থালির স্বাভাবিক কাজকর্মও ব্যাহত হচ্ছে।

কাপ্তাই নতুন বাজারের ব্যবসায়ী সাইফুল আলম বলেন ” টানা বৃষ্টিতে বাজারে ক্রেতা কমে গেছে। বিক্রি কমে যাওয়ায় লোকসানের আশঙ্কা বাড়ছে।”

কৃষক নুর কবির বলেন, “জমিতে পানি জমে থাকায় সবজি ও আমন চাষ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দ্রুত বৃষ্টি না কমলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।”

বড়ইছড়ি এলাকার দিনমজুর মনির হোসেন বলেন, “কয়েক দিন ধরে কোনো কাজ নেই। সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।”

রাইখালী এলাকার শিক্ষার্থী সাজাইউ মারমা বলেন, “পাহাড়ি রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে যাওয়ায় স্কুলে যেতে ভোগান্তি হচ্ছে। অনেক অভিভাবকও দুশ্চিন্তায় আছেন।”

কাপ্তাই ঢাকাইয়া কলোনির গৃহিণী আকলিমা বেগম বলেন, “টানা বৃষ্টিতে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। বাজার-সদাই থেকে শুরু করে পরিবারের স্বাভাবিক কাজও কঠিন হয়ে পড়েছে।”

কাপ্তাই বিদ্যুৎ বিভাগের আবাসিক প্রকৌশলী মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, “ভারী বর্ষণে পাহাড়ধস ও গাছ উপড়ে পড়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। দুর্গম এলাকায় ঝুঁকি নিয়েই আমাদের কর্মীরা দিন-রাত কাজ করছেন, যাতে মানুষের ভোগান্তি দ্রুত কমানো যায়।”

কাপ্তাই উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রুইহ্লা অং মারমা বলেন, “দুর্যোগ মোকাবিলায় উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের জন্য পাঁচটি এবং কেন্দ্রীয়ভাবে একটি—মোট ছয়টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। ওআরএস, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, আইভি ফ্লুইড ও অ্যান্টি স্নেক ভেনম পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুত রয়েছে। মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যশিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।”

কাপ্তাই উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা রায়হানুল কবির বলেন, “মানুষের জীবন রক্ষা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে। কর্মহীন মানুষের জন্য সরকারি সহায়তা অব্যাহত রয়েছে। যারা এখনো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান করছেন, তাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। প্রশাসনের সব বিভাগ সার্বক্ষণিক মাঠে থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।”

কাপ্তাই উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন বলেন, “দুর্যোগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমাতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী পরিবারগুলোর নিরাপদ পুনর্বাসন, টেকসই সড়ক ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে প্রতিবছরই একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।”

আবহাওয়া সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে পার্বত্য অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা থাকায় পাহাড়ধস ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি কাটেনি। তাই প্রয়োজন ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ঢাল ও পাদদেশে অবস্থান না করার জন্য স্থানীয় প্রশাসন সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
+ posts

Similar Posts

  • কাপ্তাইয়ের বড়ইছড়িতে বাজার মনিটরিং, জ্বালানি তেল মজুদে কঠোর হুঁশিয়ারি

    নিজস্ব প্রতিবেদক: রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলায় জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে বাজার মনিটরিং জোরদার করেছে উপজেলা প্রশাসন। রবিবার (৮ মার্চ) কাপ্তাই উপজেলার বড়ইছড়ি এলাকায় জ্বালানি তেলের মজুদ পরিস্থিতি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারমূল্য…

  • প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খানের সঙ্গে শ্রমিক দল নেতাদের সৌজন্য সাক্ষাৎ

    মানিক দাশ, কাপ্তাই  বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি মোঃ আবুল কালাম আজাদ এবং রাঙামাটি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোঃ কবিরুল ইসলাম (কবির) মঙ্গলবার (৮ মার্চ) প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। সাক্ষাৎকালে দেশের চলমান…

  • স্বাধীনতা দিবসে কাপ্তাই উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা

    ঝুলন দত্ত, কাপ্তাই মহান স্বাধীনতা দিবসে কাপ্তাই উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় উপজেলা  শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীদের পরিবেশনায় বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) বিকেল ৪ টা হতে সন্ধ্যা অবধি কাপ্তাই উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে   মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এতে  বাচিক শিল্পী নুর মোহাম্মদ বাবুর সঞ্চালনায় …

  • কাপ্তাইয়ে ৬১০ কৃষকের হাতে কৃষি উপকরণ, শুরু জাতীয় ফল মেলা

    নিজস্ব প্রতিবেদক রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে ২০২৫–২৬ অর্থবছরের কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় ৬১০ জন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের মধ্যে বৃক্ষের চারা, জৈব সার, বাঁশের খুঁটি, লেবুর চারা, গ্রীষ্মকালীন সবজির বীজ ও রাসায়নিক সার বিতরণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে উপজেলা পর্যায়ে জাতীয় ফল…

  • শিলছড়িতে বিশুদ্ধ পানির হাহাকার: একটি টিউবওয়েলের ওপর নির্ভর প্রায় ২ হাজারের অধিক মানুষের জীবন

    আবদুল হাই খোকন :পার্বত্য জেলা রাঙামাটির দুর্গম শিলছড়ি এলাকায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট এখন মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। শীলছড়ি বাজার, ভেলুয়াপাড়া, ওয়াপদা, ইষ্টার্লিং, মাঠ এলাকা, বালুরচর, সিতারঘাট ও হাজিরটেক সহ আরো কয়েকটি পাড়া-মহল্লার প্রায় দুই হাজারের বেশি মানুষ বর্তমানে নির্ভর…

  • নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে কাপ্তাইয়ে কৃষকদের জিএপি প্রশিক্ষণ

    নিজস্ব প্রতিবেদক নিরাপদ ও মানসম্মত কৃষিপণ্য উৎপাদনে কৃষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে দিনব্যাপী ‘উত্তম কৃষি চর্চা (গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস-জিএপি)’ সার্টিফিকেশন প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (১৭ জুন) কাপ্তাই হর্টিকালচার ট্রেনিং সেন্টারের হলরুমে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কাপ্তাইয়ের উদ্যোগে এ প্রশিক্ষণের আয়োজন…

Leave a Reply